সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ঘিরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। এর প্রভাব পড়তে পারে রান্নার গ্যাস ও তেল সরবরাহের উপর—এই আশঙ্কায় অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে যেসব পরিবার প্রতিদিনের রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডারের উপর নির্ভরশীল, তারা ভাবতে শুরু করেছিলেন ভবিষ্যতে গ্যাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে কি না। এই নিয়ে অনেকের মনে এই সংশয় তৈরি হয়েছে, কি হবে ভবিষ্যতে রান্নার গ্যাস না পেলে তারা রান্না করবেন কিভাবে?

তবে কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। সরবরাহে যাতে কোনও বড় সমস্যা না হয়, সেই লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কেন তৈরি হয়েছিল গ্যাস সংকটের আশঙ্কা

বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন হয় Strait of Hormuz বা হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে এই পথ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দেয়। এরপর থেকেই শুরু হয় জল্পনা এবং আশঙ্কা।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই এখানে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে চিন্তার ছাপ দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে রান্নার গ্যাস বা Liquefied Petroleum Gas (LPG) নিয়ে মানুষ বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন।

তবে কেন্দ্রের বক্তব্য, পরিস্থিতি যতটা আশঙ্কাজনক বলে মনে করা হচ্ছিল বাস্তবে ততটা নয়। সরবরাহ বজায় রাখতে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিকল্প দেশ থেকে গ্যাস ও তেল আমদানির উদ্যোগ

সরকার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তার কারণে বিকল্প দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে বাইরের দেশে যতই যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হোক ভারতের রান্নার গ্যাস নিয়ে কোন সংকট তৈরি হবে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশ হল—

  • United States
  • Canada
  • Algeria

এই দেশগুলি থেকে অতিরিক্ত তেল ও গ্যাস আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে দেশের চাহিদা পূরণে কোনও সমস্যা না হয়।

একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, কিছু ভারতীয় জাহাজ ইতিমধ্যেই Iran-এর অনুমতি নিয়ে হরমুজ প্রণালী পার হয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

বুকিং নিয়মে বড় পরিবর্তন

সরবরাহে ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার বুকিংয়ের ব্যবধান বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে নতুন সিলিন্ডার বুক করতে ২১ দিন অপেক্ষা করতে হতো, এখন সেটি বাড়িয়ে ২৫ দিন করা হয়েছে। সরকারের মতে, এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য হল আতঙ্কে অতিরিক্ত বুকিং বন্ধ করা। অনেক সময় গুজব ছড়ালে মানুষ একাধিক সিলিন্ডার বুক করার চেষ্টা করেন। এতে সাময়িকভাবে সরবরাহের উপর চাপ বাড়ে।

সাধারণ পরিবারকে অগ্রাধিকার

সরকার জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • সাধারণ পরিবার
  • হাসপাতাল
  • স্কুল
  • জরুরি পরিষেবা

এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

সরবরাহের ঘাটতি যাতে না হয়, সেই লক্ষ্যে দেশীয় উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে।

সরকারি সূত্র অনুযায়ী, মার্চ মাসের শুরু থেকে দেশের ভেতরে LPG উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কিছুটা সমস্যা হলেও দেশের চাহিদা মেটানো সহজ হবে।

পাইপড গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহ

সরকার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে—পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ হওয়া গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া।

দেশের অনেক শহরে এখন Piped Natural Gas (PNG) পরিষেবা চালু রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ লক্ষ পরিবার এই পরিষেবার আওতায় রয়েছে।

এই পরিবারগুলিকে সম্ভব হলে রান্নার জন্য পাইপড গ্যাস ব্যবহার করতে বলা হয়েছে যাতে সিলিন্ডারের উপর চাপ কিছুটা কমে।

হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

হোটেল ও রেস্তোরাঁ শিল্পেও গ্যাসের ব্যবহার অত্যন্ত বেশি। এই বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য একটি বিশেষ কোটা ঘোষণা করেছে।

বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত ১৯ কেজির নীল রঙের গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহে প্রায় ২০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং ছোট খাবারের দোকানগুলির ব্যবসায় যাতে সমস্যা না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

নজরদারির জন্য বিশেষ কমিটি

গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার জন্য তেল বিপণন সংস্থাগুলির একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এই কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে—

  • গ্যাস সরবরাহের অবস্থা
  • মজুতের পরিমাণ
  • ডেলিভারি সময়

এই সমস্ত বিষয় নিয়মিত পর্যালোচনা করছে।

মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে অভিযান

সংকটের সময় অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গ্যাস মজুত করে বা কালোবাজারি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন।

এই ধরনের কাজ ঠেকাতে সরকার বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। বিশেষ করে—

  • Uttar Pradesh
  • Delhi
  • Maharashtra

এই সব জায়গায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

দেশে তেল সরবরাহ নিয়ে আশ্বস্ত করল সরকার

সরকার জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে পেট্রোল ও ডিজেলের কোনও বড় ঘাটতি নেই।

ভারতের মোট পরিশোধন ক্ষমতা প্রায় ২৫৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। দেশের বিভিন্ন রিফাইনারি প্রায় পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে।

গুজবে কান না দেওয়ার আবেদন

সরকার সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্কে না ভোগার পরামর্শ দিয়েছে। অনেক সময় সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ অযথা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

সরকারের বক্তব্য—

  • গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন কোনও পরিস্থিতি নেই
  • অতিরিক্ত সিলিন্ডার বুক করার দরকার নেই
  • নিয়ম মেনে বুকিং করলে স্বাভাবিকভাবেই ডেলিভারি পাওয়া যাবে

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও ভারত সরকার জানিয়েছে যে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। বিকল্প দেশ থেকে আমদানি, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, বুকিং নিয়মে পরিবর্তন এবং কালোবাজারি রোধ—এই সব মিলিয়ে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ পরিবারের রান্নাঘরে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত খুব কম বলেই মনে করা হচ্ছে। সরকারও আশ্বস্ত করেছে যে পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের কাছে একটাই বার্তা—গুজব নয়, সরকারি তথ্যের উপর ভরসা করুন এবং স্বাভাবিক নিয়মেই গ্যাস বুকিং ও ব্যবহার চালিয়ে যান।